বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ : ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর জন্যে

সূচনা
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ আর এই অসংখ্য উৎসবের মধ্যে পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ হলো সর্বজনীন এক উৎসব। এই উৎসবের প্রাণকেন্দ্র হলো বৈশাখী মেলা। গ্রাম থেকে শহর প্রতিটি প্রান্তেই এই দিনটিকে ঘিরে মেলার আয়োজন করা হয়। বৈশাখী মেলা কেবল কেনাকাটার জায়গা নয় বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের ধারক। নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এই আনন্দঘন পরিবেশে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এক কাতারে শামিল হয়। ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষায় বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ লেখার প্রয়োজন হয় কারণ এটি আমাদের জাতীয় চেতনার সাথে গভীরভাবে জড়িত। মেলার রঙিন আমেজ আর উৎসবমুখর পরিবেশ আমাদের যান্ত্রিক জীবনে প্রশান্তির ছোঁয়া দিয়ে যায়। এই মেলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের শেকড়কে খুঁজে পাই এবং উত্তরসূরিদের কাছে নিজস্ব ঐতিহ্য তুলে ধরি।
বৈশাখী মেলার ঐতিহাসিক পটভূমি
বৈশাখী মেলার ইতিহাস দীর্ঘদিনের পুরনো এবং এটি মূলত গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে উঠেছে। ঐতিহাসিকভাবে মেলার এই প্রচলন শুরু হয়েছিল ফসলি সন বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের সময় থেকে। মোগল সম্রাট আকবর যখন খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে নতুন বাংলা সনের প্রবর্তন করেন তখন থেকেই নববর্ষকে ঘিরে নানা উৎসবের সূচনা হয়। সেই সময়ে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে পুণ্যাহ অনুষ্ঠান হতো এবং একে কেন্দ্র করে ছোট ছোট মেলার আয়োজন করা হতো। কালক্রমে সেই আয়োজনই আজকের বিশাল বৈশাখী মেলায় রূপান্তর লাভ করেছে। বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এটি একসময় কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বসলেও পরে তা সাংস্কৃতিক মিলনোৎসবে পরিণত হয়। প্রাচীনকালে জমিদারদের বাড়িতে কিংবা নদীর তীরে বটতলায় এই মেলা বসত যেখানে মানুষ সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত। বর্তমানে এই মেলা আধুনিক রূপ পেলেও এর মূল ভিত্তিটি এখনও সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
আরও পড়ুনঃ অধ্যবসায় রচনা ২০ পয়েন্ট : জেনে নিন সকল শ্রেণীর জন্যে…
৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির উপযোগী বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ
বৈশাখী মেলা হলো বাঙালির আনন্দ আর ঐতিহ্যের এক মিলনমেলা। বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামের কোনো খোলা মাঠে কিংবা বটতলায় এই মেলা বসে এবং সারা দিনব্যাপী চলে আনন্দের উৎসব। মেলায় হরেক রকমের জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ছোটদের জন্য মাটির তৈরি পুতুল, কাঠের ঘোড়া, রঙিন বাঁশি আর বেলুন মেলার প্রধান আকর্ষণ। বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ এর এই ছোটদের অংশে নাগরদোলার কথা না বললেই নয় যার ওপরে উঠে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। মেলার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হলো মুখরোচক খাবারের দোকান যেখানে কদমা, বাতাসা, মুড়লি আর জিলাপির গন্ধে চারপাশ মৌ মৌ করে। মেলায় বিভিন্ন লোকজ বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে যেমন পুতুল নাচ আর জাদুকরের বিচিত্র খেলা। গ্রামের মেলায় মাটির হাঁড়ি-পাতিল আর শখের নকশা করা পাখা বেশ জনপ্রিয়। আমরা বন্ধুরা মিলে মেলায় গিয়ে অনেক কেনাকাটা করি আর মেলা শেষে মনের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফিরি। এই মেলা আমাদের একে অপরের সাথে দেখা হওয়ার এবং ভাব বিনিময়ের চমৎকার সুযোগ করে দেয়। বৈশাখী মেলা আমাদের শেখায় কীভাবে হিংসা বিদ্বেষ ভুলে সবাই মিলেমিশে সুখে থাকা যায়। এটি কেবল একটি মেলা নয় বরং আমাদের শৈশবের অনেক রঙিন স্মৃতির এক ভাণ্ডার।
৯ম ও ১০ম শ্রেণির উপযোগী বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ
বাঙালির হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হলো বৈশাখী মেলা। নববর্ষের প্রথম দিনে দেশের প্রতিটি প্রান্তে যে উৎসবের জোয়ার বয়ে যায়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে এই মেলা। ৯ম ও ১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ কেবল একটি বর্ণনা নয়, বরং এটি আমাদের লোকশিল্প ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হওয়ার একটি মাধ্যম। এই মেলায় গ্রামবাংলার কুটির শিল্পের এক বিশাল প্রদর্শনী দেখা যায়। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির সরা, পুতুল, হাতি, ঘোড়া আর শখের হাড়ি দেখে বাঙালি সংস্কৃতির গভীরতা অনুভব করা যায়। এছাড়া বাঁশ ও বেতের তৈরি ডালা, কুলা, চালুনি আর শীতলপাটির পসরা মেলার শোভা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্বও অনেক কারণ এর মাধ্যমে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পীরা তাদের সৃজনশীলতা প্রদর্শনের এবং উপার্জনের সুযোগ পান। মেলার উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ তাদের ভেদাভেদ ভুলে সামাজিক ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, বায়োস্কোপের রঙিন জগৎ আর লোকসংগীতের সুর মেলাকে এক প্রাণবন্ত রূপ দান করে। মেলার এক কোণে বসা জিলাপি আর মিষ্টির দোকানের ভিড় বাঙালির ভোজনরসিক সত্তাকে মনে করিয়ে দেয়। বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ এর মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে এই মেলা কেবল আনন্দ উপভোগের স্থান নয়, বরং এটি আমাদের শিকড়কে টিকিয়ে রাখার এক অন্যতম প্রয়াস। শহুরে জীবনেও এখন মেলার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে নাগরিক মানুষ যান্ত্রিকতা ভুলে গ্রামীণ মেলার স্বাদ নিতে সমবেত হয়। আমাদের এই অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
আরও পড়ূনঃ জুলাই বিপ্লব ২০২৪ বাংলাদেশ রচনা : নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয়
উচ্চমাধ্যমিক (HSC) পর্যায়ের জন্য বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ
বৈশাখী মেলা বাঙালির জাতীয় জীবনের এক শাশ্বত সাংস্কৃতিক উৎসব যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক ও বাহক হিসেবে স্বীকৃত। পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই মেলা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও জাতিসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের বিবর্তন ও লোকজ সংস্কৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, মুঘল সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই বঙ্গাব্দ গণনার সাথে সাথে এই মেলার প্রচলন শুরু হয়েছিল। মূলত খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে প্রবর্তিত নববর্ষ উৎসবে এই মেলা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির চালিকাশক্তি। আধুনিক বিশ্বায়নের যুগেও বৈশাখী মেলা তার আদিম বৈশিষ্ট্য ও আবেদন হারায়নি। এটি এমন এক মহামিলন ক্ষেত্র যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত কোনো বিভেদ থাকে না; বরং সবাই একীভূত হয় বাঙালি পরিচয়ে। মেলার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর লোকজ বিনোদন এবং প্রদর্শিত হস্তশিল্প। পুতুলনাচ, সার্কাস, লাঠিখেলা আর গম্ভীরার সুর মেলাকে এক মহাজাগতিক আবহ দান করে। ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই মেলার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামবাংলার এই মেলা এখন কেবল বটতলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজধানী ঢাকার রমনা বটমূল থেকে শুরু করে প্রতিটি মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রে এর বিস্তার ঘটেছে। বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ এর এই বিস্তারিত আলোচনায় আমাদের কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতিফলন পাওয়া যায়। মেলায় আসা মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প আর চারুশিল্পের অপূর্ব সমন্বয় বাঙালির নান্দনিক রুচির বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। গ্রামীণ কারিগররা তাদের সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল এই মেলায় নিয়ে আসেন যা আমাদের দেশীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে আধুনিকতার চাপে অনেক সময় এই মেলার প্রকৃত লোকজ আবেদনগুলো ফিকে হয়ে আসছে। অপসংস্কৃতির হাত থেকে আমাদের এই প্রাণের মেলাকে রক্ষা করা এবং এর নির্মল আনন্দকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। বৈশাখী মেলা আমাদের ঐতিহ্যের অহংকার এবং এটি বাঙালির পরিচয়কে বিশ্বের দরবারে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। তাই নববর্ষের এই আনন্দযাত্রায় মেলার আবেদন চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে অম্লান হয়ে থাকবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: গ্রামীণ বনাম শহুরে মেলা
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বৈশাখী মেলার ধরনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আগে এই মেলা কেবল গ্রামকেন্দ্রিক থাকলেও বর্তমানে শহুরে জীবনেও এর প্রভাব প্রবল। গ্রামীণ বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ এ আমরা দেখি ধুলোমাখা মেঠো পথ, বটতলার শীতল ছায়া আর সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম উল্লাস। গ্রামের মেলাগুলোতে এখনও মাটির তৈরি খেলনা আর দেশীয় খাবারের প্রাধান্য বেশি থাকে। অন্যদিকে শহরের মেলাগুলো অনেকটা আধুনিক ও সুশৃঙ্খলভাবে আয়োজিত হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার রমনা বটমূল, চারুকলা ইনস্টিটিউট কিংবা ধানমন্ডি লেক এলাকায় যে মেলার আয়োজন হয় তা আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের এক মিশেল। শহরের মেলাগুলোতে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায় এবং বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান মেলার পৃষ্ঠপোষকতা করে। বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ এর এই আধুনিক সংষ্করণে দেখা যায় যে শহরের মানুষ তাদের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার জন্য এই একদিন কৃত্রিমতা ছেড়ে বাঙালি সাজে মেতে ওঠে। গ্রামের মেলা যেখানে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটায়, শহরের মেলা সেখানে সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বেশি গুরুত্ব পায়। তবে স্থানভেদে পার্থক্য থাকলেও উভয় মেলার মূল উদ্দেশ্য এক অর্থাৎ নতুন বছরকে আনন্দের সাথে বরণ করে নেওয়া এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানানো।
আরও পড়ূনঃ বর্ষাকাল রচনা ২০ পয়েন্ট : ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর জন্যে
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায় যে বৈশাখী মেলা কেবল একটি বিনোদনের মাধ্যম নয় বরং এটি বাঙালির আত্মপরিচয় রক্ষার এক শক্তিশালী হাতিয়ার। বর্তমানের বিশ্বায়ন ও অপসংস্কৃতির ভিড়ে বৈশাখী মেলা অনুচ্ছেদ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। এই মেলা অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দেয় এবং মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন মজবুত করে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও মেলার এই চিরাচরিত আবেদন ম্লান হয়নি বরং প্রতিবছর এটি নতুন উদ্যমে ফিরে আসে। নতুন প্রজন্মের কাছে দেশীয় সংস্কৃতির এই রূপ তুলে ধরা এবং মেলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। মেলার এই মিলনমেলা যুগ যুগ ধরে চলুক এবং বাঙালির মনে বাঙালিয়ানা অটুট রাখুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা। নববর্ষের এই জয়ধ্বনি মেলার প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমাদের জীবনকে আরও সমৃদ্ধ ও আনন্দময় করে তুলুক। মেলার এই ঐতিহ্যই আমাদের আগামীর পথ চলার অনুপ্রেরণা।






